বাংলাদেশের ভোট-যুদ্ধে সংখ্যালঘু: অদেখা বলির খাঁড়ি
বাংলাদেশের ভোট-যুদ্ধে সংখ্যালঘু: অদেখা বলির খাঁড়ি
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আর পাঁচ সপ্তাহও বাকি নেই। অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে আজ সবচেয়ে তলানিতে এসে ঠেকেছে। ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর আবির্ভাবের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে, উন্নতির কোনো চিহ্ন কখনোই দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার নিরাপত্তা জোরদার করা কিংবা নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা স্বীকার করার বদলে এক ধরনের উদাসীনতা ও আত্মতুষ্টির আশ্রয় নিয়েছে।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও এই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশের প্রতিবেশী সম্পর্ক এক অস্বস্তিকর মোড় নিয়েছে। ঢাকা ধীরে ধীরে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে, আর ভারত….যে দেশটি একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ছিল, তার সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হয়ে উঠছে। একই সময়ে দেশে রাজনৈতিক, জাতিগত, সাম্প্রদায়িক ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার নতুন নতুন রূপ একযোগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ইসলামপন্থীরা দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। ঐতিহাসিকভাবে এরা বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী শক্তির মুখপাত্র। এখন তারাই সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ; ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও ঠান্ডা করে রাখার কৌশল হিসেবে।
জুলাই অভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিগুলোর ভারতবিরোধী সুর আরও জোরালো হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালকে ‘ভারতের মদদপুষ্ট’ বলে আখ্যা দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধেই সব অভিযোগ কেন্দ্রীভূত করা হয়। তথাকথিত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ একাংশ, যারা পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বাঁধে, প্রকাশ্যে দাবি করতে থাকে, ভারত আওয়ামী লীগকে ‘দাসে’ পরিণত করেছিল এবং বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য কায়েম করেছিল। এই রাজনৈতিক বয়ান শুধু বিরোধী দলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; অন্তর্বর্তী সরকারও কার্যত এই ভাষ্যকে বৈধতা দিয়েছে।
আওয়ামী লীগকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে সংকুচিত করে দেখানোর ফলে ভারতবিরোধিতা একদিকে যেমন মূলধারায় ঢুকে পড়েছে, অন্যদিকে তা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সুবিধাজনক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও দেশের প্রতিটি বড় অস্থিরতার দায় চাপাচ্ছে ভারতের ঘাড়ে, নিজেদের জবাবদিহি এড়িয়ে গিয়ে। ঢাকার অভিযোগ, ভারত নাকি তার ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, যা নয়াদিল্লি স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বুঝতে হলে ক্রমবর্ধমান উগ্রপন্থার উত্থানকে উপেক্ষা করা যায় না। আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতায় ইসলামপন্থীরা আক্রমণ চালিয়েছে দেশের মূল ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের ওপর, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পরপরই সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, উপাসনালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে সহিংসতা শুরু হয়। শুধু আগস্ট মাসেই দুই হাজারের বেশি ঘটনার খবর পাওয়া যায়। তবু অন্তর্বর্তী সরকার এই হামলাগুলোকে ‘রাজনৈতিক’ বলে আখ্যা দিয়ে এর সাম্প্রদায়িক চরিত্র অস্বীকার করেছে।
সংখ্যালঘুদের ‘আওয়ামী লীগ সমর্থক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ আওয়ামী লীগই ছিল বাংলাদেশের প্রধান ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি। ফলে সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাতকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে নীরবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে ইসলামপন্থীদের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। আশ্চর্যের বিষয়, সরকার যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, তার একটিও সংখ্যালঘু অধিকারকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়নি, যা সরকারের মানসিকতা সম্পর্কে যথেষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদন, যেখানে ভূমি দখল, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার মতো সহিংসতার কথা বলা হয়েছে, সরকার তা ‘মিথ্যা’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অথচ ইউএসসিআইআরএফ স্পষ্ট করেছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে।
২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। তৌহিদী জনতার মতো গোষ্ঠী ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে হামলা চালিয়েছে। হেফাজতে ইসলাম প্রকাশ্যে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে এবং ইসকন নিষিদ্ধের আহ্বান জানিয়েছে, ভারতের এজেন্ট বলে দাগিয়ে। গত জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘ধর্ম অবমাননার’ গুজব ছড়িয়ে অন্তত ৭১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
গত মাসে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যার পর নতুন করে উন্মত্ততা দেখা যায়। ইসলামপন্থী জনতা প্রথোম আলো ও ডেইলি স্টারের অফিসে আগুন দেয়, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা চালায়, বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙচুর করে। এমনকি ভারতের হাইকমিশনের সামনেও বিক্ষোভ হয়।
ময়মনসিংহে দীপু দাসের পোড়ানো নগ্ন লাশ, একটি সভ্য সমাজের বিবেককে চূর্ণ করে দেয়। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর রাউজান ও পিরোজপুরে সংখ্যালঘুদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ চলতেই থাকে।
স্পষ্টতই, পাকিস্তানপন্থী ইসলামপন্থীরা সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করছে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে। ভারতের সামান্য উদ্বেগ প্রকাশও ‘হস্তক্ষেপ’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সংখ্যালঘু পরিচয় মানেই ‘ভারতের এজেন্ট’, এই বিপজ্জনক ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইসলামপন্থী ও তাদের আদর্শিক পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তানই সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে। যদি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা শক্তিগুলো ক্ষমতায় আসে, সংখ্যালঘুদের ভবিষ্যৎ যে আরও অন্ধকার হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই নকশা চিনে নেওয়া জরুরি। নইলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলই অস্থিতিশীলতার আগুনে পুড়বে।
What's Your Reaction?